মেডিক্যালে ভর্তির সুযোগ পেয়েও দুশ্চিন্তায় রাকিবুল

রাকিবুল হাসান (২০), বাবা প্রান্তিক কৃষক আকরাম মোল্যা। মা-বাবা, চার ভাই নিয়ে কোনমতে দিন কাটে তাদের। উল্টো নিজের পড়ার খরচ জোগাতে ছয় মাস ছাত্র পড়িয়েছেন রাকিবুল।

নিজের চেষ্টায় সারা জীবন পড়ালেখা করেছেন পাড়াগাঁয়ের এই মেধাবী ছেলে। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অদম্য মেধার পরিচয় দিয়েছেন। বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ হয়েছে তার।

কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণে এখন বড় বাধা অর্থ। ভর্তি থেকে শুরু করে পরবর্তী পড়ালেখার খরচ কীভাবে জুটবে, এই চিন্তা এখন গোটা পরিবারের। বাবা আকরাম মোল্যা একজন প্রান্তিক কৃষক। নিজের সামান্য জমি চাষ করেন। যা আয় করেন, তা দিয়ে ঠিকমতো সংসারই চলে না, সেখানে ছেলের পড়ার খরচ কোথা থেকে আসবে এই চিন্তা তার। পরিবারের সদস্যদের আশঙ্কা, অর্থের অভাবে ছেলের স্বপ্ন শেষ না হয়ে যায়!

রাকিবুলের বাড়ি মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া ইউনিয়নের চর বড়রিয়া গ্রামে।

রাকিবুলের বাবা বলেন, অভাবের সংসার আমার। নিজের মাঠে সব মিলে ৬০ শতাংশ চাষযোগ্য জমি আছে। ৯ শতক জমির ওপর ভিটেবাড়ি। টিনের দুই কক্ষের ঘরের একটিতে রাকিবুল পড়ালেখা করে। আর বারান্দা ঘিরে আমরা স্বামী-স্ত্রী দুই ছেলে নিয়ে ঘুমাই। বাড়িতে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি আর কবুতর পালন করি। বড় ছেলে শামীম মোল্যা পড়ালেখা শেষ করে বেসরকারি একটি কোম্পানিতে চাকরি শুরু করেছে।

মেধাবী রাকিবুল হাসানের বাবা পড়ালেখা না জানলেও মা মাহামুদা বেগম এসএসসি পাশ। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই রাকিবুলের পড়ালেখার প্রতি খুবই আগ্রহ। সারাক্ষণ পড়ালেখা নিয়েই থাকে। কখনো ছেলেকে পড়ার কথা বলতে হয়নি। বাড়িতে পড়ালেখা করেই সবসময় ভালো ফল করেছে। কোনো পরীক্ষায় রাশেদুল দ্বিতীয় হননি।

মা বলেন, ‘ছেলের অনেক দিনের স্বপ্ন ডাক্তারি পড়ার। এখন মেডিক্যালে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু পড়ানোর ক্ষমতা আমাদের নেই। স্বামী কৃষি কাজ থেকে সামান্য আয় করেন। বাড়িতে গরু লালন-পালনের পাশাপাশি কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। এভাবে কোনো রকমে সংসার চলে। ছেলেকে পড়ালেখার খরচ ঠিকমতো দিতে পারি না। গ্রামের লোকজন ও স্কুলের শিক্ষকেরা মাঝেমধ্যে কিছু সহযোগিতা করেছেন, যা দিয়ে ছেলের পড়ালেখার কিছু খরচ হয়েছে। তাছাড়া মোটা টাকা প্রয়োজনের সময় বাড়ির একটি গরু বিক্রি করতে হয়েছে।’

মাহামুদা বেগম বলেন, এখন ছেলের ভর্তিসহ পরবর্তী পড়ালেখার খরচ কীভাবে জোগাড় করবেন, তা নিয়ে চিন্তিত। কখনো কখনো মনে হচ্ছে, টাকার অভাবে ছেলের স্বপ্ন শেষ না হয়ে যায়।

রাকিবুল বলেন, বাবা পড়ালেখার খরচ দিতে পারেন না, তাই কখনো প্রাইভেট পড়তে যাইনি। বাড়িতে পড়ালেখা করেই ভালো ফল নিয়ে এসেছে।

ভালো রেজাল্টের বিষয়ে তিনি জানান, দিন-রাতে কমপক্ষে ১৪ ঘণ্টা পড়ালেখা করেছেন তিনি। বাড়ির বাইরে খুব কম যেতেন। তিনি বলেন, গ্রামের সরকারি প্রাইমারি স্কুলে পড়ালেখা করেছি। পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছিলেন। এরপর পার্শ্ববর্তী বালিদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০২০ সালে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ নিয়ে এসএসসি পাস করি। উপজেলা সদরে অবস্থিত আমিনুর রহমান কলেজ থেকে ২০২২ সালে এইচএসসি পাস করেছি। ফলাফল জিপিএ-৫ এসেছে।

আমিনুর রহমান কলেজের সহকারী অধ্যাপক ওয়াসিউজ্জামান বুলবুল বলেন, ছেলেটির আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। তবে পড়ার প্রতি রয়েছে যথেষ্ট আগ্রহ। মেডিক্যালে ভর্তির সুযোগ পেয়েও আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল রাকিবুল। আমি তাকে সাহস দিয়েছি, কিন্তু প্রয়োজন অর্থের।

গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মান্নান বলেন, ‘রাকিবুলের মতো ছেলে পাওয়া যায় খুবই কম। সে ডাক্তার হলে এলাকার মানুষ উপকৃত হবে।’

রাকিবুল জানান, এসএসসি পাসের পর অর্থের অভাবে কলেজে ভর্তি হতে পারছিলেন না। এমন সময় তার বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আব্দুস সালাম কিছু টাকা দিয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। এই সুযোগ না হলে তখনই হয়তো পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যেত। রাকিবুল চিকিৎসক হয়ে গ্রামের মানুষের সেবা করার স্বপ্ন দেখেন। এই স্বপ্ন পূরণে সবার সহযোগিতা চান তিনি।

Leave a Comment