এসএসসিতে ফেল করেও ট্যাক্স ক্যাডার হলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহেল

সদ্য ঘোষিত ৪০তম বিসিএসে ট্যাক্স ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন সাইফুল ইসলাম সোহেল। ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ২০০৭ সালে প্রথমবার এসএসসি পরীক্ষায় ফেলও করেছিলেন তিনি। কিন্তু থেমে থাকেননি। করেছেন বিসিএসের স্বপ্ন জয়।

বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন কবে থেকে দেখেছেন?
সাইফুল ইসলাম সোহেল: স্বপ্ন দেখা শুরু করি অনার্স প্রথম বর্ষ থেকে আমার ছোট মামা আমাকে বুঝাতে সক্ষম হন যে আমাদের মতো নিম্ন মধ্যবিত্তদের জন্য বিসিএস ছাড়া সমাজের সেবা করা সম্ভব নয় তখন থেকে স্বপ্ন দেখা শুরু।

স্বপ্ন পূরণের প্রস্তুতি কীভাবে নিয়েছেন, এই ক্ষেত্রে পড়াশোনার রুটিন কেমন ছিলো?
সাইফুল ইসলাম সোহেল: অনার্স প্রথম বর্ষ থেকে দু-একটা টিউশন করা শুরু করি এবং নিজের মত করে গণিত, বাংলা প্রস্তুতি নেই। বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কবি সাহিত্যিকদের বই পড়া শুরু করি। অনার্স ফাইনাল দিয়েই মূলত বিসিএস এর জন্য অন্যান্য বই কিনে পড়া শুরু করি। বিসিএস এর জন্য ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। আমি প্রতিদিন আট ঘন্টা পড়তাম। যত কিছুই হোক না কেন আটঘন্টা মিস দিতাম না।

এই সংগ্রামের পথে আপনার কোন স্মরণীয় কিংবা দুঃখের ঘটনা মনে পড়ে?
সাইফুল ইসলাম সোহেল: নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের জন্য প্রতিটাদিনই সংগ্রামের। পকেটে এক টাকাও থাকতো না। দুই কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে টিউশনি করতাম। পরীক্ষায় আবেদন করা, ঢাকায় গিয়ে পরীক্ষা দেওয়া, বই কেনা এসব করে টিউশনির টাকা মাসের প্রথম সপ্তাহে শেষ হয়ে যেত।

আপনার আইডল কে?
সাইফুল ইসলাম সোহেল: আমার আইডল আমার মামা এস এম সোলায়মান। তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির নিউইয়র্ক প্রতিনিধি এবং সমাজকর্মী।

দেখা যায় ক্যাডার হওয়ার পর দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার একটা প্রবণতা সৃষ্টি হয়, এক্ষেত্রে আপনার বক্তব্য কি?
সাইফুল ইসলাম সোহেল: দুর্নীতি-অনিয়ম করে এমন কর্মকর্তার সংখ্যা কম কিন্তু তাদের প্রচার বেশি। বেশিরভাগ কর্মকর্তাদের সততা ও নিষ্ঠাবান কিন্তু তাদের বিষয়গুলো প্রচারে আসে না।

নতুন যারা বিসিএস দিতে চান বা বিসিএসে ভালো কিছু করতে চান তাদের জন্য পরামর্শ কি?
সাইফুল ইসলাম সোহেল: বিসিএস পরিশ্রম এবং ধৈর্যের পরীক্ষা। নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝে সিলেবাস অনুযায়ী রুটিন করে পড়লে বিসিএস থেকে ভালো কিছু পাওয়া যাবে। নির্দিষ্ট কোন বিষয়ে ভালো হওয়ার চেয়ে সব বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। আমাদের স্বাভাবিক প্রবণতা আমরা যেসব বিষয় বুঝিনা বা পারিনা তা পড়ি না। এমন অভ্যাস বাদ দিতে হবে। সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহার না করাই ভালো।

ভাইভা ও রিটেন নিয়ে বিস্তারিত বলুন?
সাইফুল ইসলাম সোহেল: রিটেন ভালো করার জন্য প্রস্তুতি শুরু করার প্রথম থেকেই প্রিলিমিনারি পরীক্ষার পড়ার পাশাপাশি রিটেনের গণিত, বিজ্ঞান, বাংলা এবং অনুবাদ চর্চা করতে হবে। রিটেন ভালো করার জন্য পত্রিকা পড়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে সম্পাদকীয় এবং আন্তর্জাতিক অংশ। ভাইভাতে ভালো করার জন্য নিজের পঠিত বিষয়, নিজের জেলা, প্রথম তিনটি পছন্দের ক্যাডার, মুক্তিযুদ্ধ সংবিধান ও সাম্প্রতিক ঘটনাসমূহ সম্পর্কে আপডেট থাকতে হবে।

পড়ালেখার পাশাপাশি নন-ফিকশন কিংবা বাইরের বই পড়ার ক্ষেত্রে আপনার মতামত কি?
সাইফুল ইসলাম সোহেল: আমি ফিকশন ও নন-ফিকশন বইগুলো অনার্সে থাকতেই পড়তাম এবং বিসিএস প্রস্তুতি নেয়ার সময় প্রতি সপ্তাহে একটি ফিকশন অথবা নন-ফিকশন বই পড়েছি। রাইটিং স্কিল বাড়াতে পত্রিকা এবং নন ফিকশন বইয়ের টপিকগুলো কাজে দেয়।

বিসিএসসহ চাকরি পরীক্ষার প্রিলিমিনারিতে সহজে পার হতে যদি প্রথম তিনটি করণীয়ের কথা বলতে বলি, তাহলে এর মধ্যে কী কী রাখবেন?
সাইফুল ইসলাম সোহেল: প্রথমত, কি চাকরি করবে তা নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ওই পরীক্ষার সিলেবাস বুঝতে হবে ভালোভাবে। তৃতীয়ত, হতাশ-অধৈর্য হয়ে হাল ছাড়া যাবে না।

বিসিএস ক্যাডারই হতে হবে— এমন একটা ব্যাপার অনেক চাকরিপ্রার্থী মনে গেঁথে নিয়েছেন। আপনার পরামর্শ কী?
সাইফুল ইসলাম সোহেল: বিসিএস ক্যাডার হতেই হবে এমন চিন্তা করা ঠিক নয়। সেবা করতে ক্যাডার হতে হবে এমন কোন কথা নেই। পলান সরকার বা আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার বিসিএস ক্যাডার নন। তারা কিন্তু দেশব্যাপী সমাদৃত।

আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই।
সাইফুল ইসলাম সোহেল: আমার মা স্বপ্ন দেখতেন ‘উনার এসএসসি ফেল ছেলে একদিন বড় সরকারি কর্মকর্তা হবে’। মায়ের সে স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পথে। এখন পরিকল্পনা সর্বোচ্চ সেবা দেশ মাতাকে দেওয়া। এবং মানুষের জন্য কাজ করা। সবার জন্য কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের দুটি লাইন-
‘সবাই মাড়িয়ে যাচ্ছে যাক মাথা উঁচু রাখো ঘাস,
একদিন তোমার কাছেই নেমে আসবে আকাশ’
সাক্ষাৎকার টি দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস থেকে নেওয়া।

Leave a Comment